নির্যাতনের আলামত মিললেও এক বছরে অগ্রগতি নেই সামিয়া হত্যা মামলার, পরিবারে হতাশার চিত্র
নির্যাতনের আলামত মিললেও এক বছরে অগ্রগতি নেই সামিয়া হত্যা মামলার, পরিবারে হতাশার চিত্র
মোঃআমজাদ হোসাইন
লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি :
এক বছর পেরিয়ে গেছে। তবুও থামেনি এক মায়ের কান্না। ১৩ বছরের সামিয়া—এখন শুধুই স্মৃতি। মেয়ের জামা-কাপড়, বইখাতা জড়িয়ে ধরে প্রতিদিনই তাকে খুঁজে ফেরেন মা শারমিন বেগম। নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গতায় কাটছে তার প্রতিটি দিন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “একে একে সবাই আসে, কিন্তু আমার মেয়ে সামিয়া আর আসে না। আমার সামিয়া… আমার কলিজা… আমার পাখি…”
২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল কুমিল্লার লাকসামের একটি মাদ্রাসায় ঘটে যায় চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তারের রহস্যজনক মৃত্যু আজও অমীমাংসিত। মৃত্যুর আগে একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক নার্সের কাছে নিজের ওপর নির্যাতনের ইঙ্গিত দিয়েছিল সামিয়া—যা এখন মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত।
ঘটনার শুরুতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ দাবি করে, সামিয়া ভবনের পঞ্চম তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। তবে পরিবার এই দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাদের অভিযোগ—সামিয়াকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনাকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কেন হাজিরা খাতা পাওয়া যায়নি? ঘটনার সময়ের সিসিটিভির গুরুত্বপূর্ণ ক্যামেরা কেন বিকল ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি।
সামিয়ার মা অভিযোগ করে বলেন, “আমার মেয়েকে ধর্ষণ করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ৫ তলা থেকে পড়লে তার তেমন আঘাত থাকতো, অথচ তার একটি হাত বাঁকা ছিল"
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে যৌন নির্যাতনের স্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে—যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় ও গুরুতর করে তুলেছে।
সামিয়ার বড় বোন জানায়, “আমাদের এক সাথে অনেক স্মৃতি, আপুর জন্য কলিজা ফেটে যাচ্ছে। আমরা কি আমার বোন হত্যার বিচার পাবো না?”
এদিকে, মামলার তদন্ত নিয়ে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। সামিয়ার মা দাবি করেন, মামলাটি আইনি প্রক্রিয়ায় না নেওয়ার জন্য তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলমগীর তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের দাবি, একই মাদ্রাসায় আগেও একাধিক অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু সেসব ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল সামিয়ার মা বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এজাহারে ৮ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও মামলায় আসামিদের অজ্ঞাত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি, গ্রেফতার হয়নি কেউ।
লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাকসুদ আহমেদ বলেন, “মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এক বছরেও যখন বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, তখন হতাশা আর ক্ষোভ বাড়ছে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে।
এতো খবর প্রকাশ। এতো আন্দোলন, এতো চেষ্টা সবকিছু ব্যার্থ হয়ে যাবে? প্রশ্ন সচেতন মহলের। এদিকে সামিয়ার জন্য থেমে নেই এক মায়ের অপেক্ষা। প্রশ্ন একটাই—ন্যায়বিচার কি আদৌ পাবে সামিয়া?
নিউজটি আপডেট করেছেন : nafizhasan889900@gmail.com
কমেন্ট বক্স